এক মহান বিজ্ঞানী "নিকোলা টেসলা" এর জীবনি এবং আবিষ্কারগুলো

বিদ্যুতের প্রকৃত জনক নিকোলা টেসলা এর জীবনি এবং আবিষ্কারগুলো

সাল ১৮৭০, নিত্যদিনের মতোই অতি সাধারণ এক সকাল বেলা। কারলোভাকের এক ক্লাসরুম, ক্লাস নিচ্ছেন শিক্ষক। বিষয়, ক্যালকুলাস। শিক্ষার্থীদের খাতায় টুকে নেয়ার দায়িত্ব দিয়ে, বোর্ডে ক্যালকুলাস এর সমাধান করতে লাগলেন শিক্ষক। অঙ্ক কষা শেষ হলে, পেছনে তাকালেন। দেখলেন, সবাই মন দিয়ে লিখছে, শুধু একজন ছাড়া। স্বভাবতই, তিনি তাকে দাড়াতে বললেন। "তুমি অঙ্কগুলো খাতায় তুলছো না কেন?", প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন তার দিকে। প্রতি-উত্তরে ছেলেটি বলল, তার না কি এগুলো নিতান্তই সহজ বলে মনে হয়। শিক্ষক তার উপর রেগে যান, ছুড়তে থাকেন একের পর এক ক্যালকুলাস। অপরদিকে, ছেলেটি কত সহজেই না সব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দিলো! একটি বার খাতা-কলম হাতে নেয়ার প্রয়োজন বোধ করলো না! তখনই শিক্ষক বুঝে যান যে, এই ছেলের ভবিষ্যত অনেক উজ্জ্বল। সেই ছেলেটিকেই আমরা এখন, ম্যাড সাইনটিস্ট 'নিকোলা টেসলা' নামে চিনে থাকি।


নিকোলা টেসলা, ১৮৫৬ সালে ১০ই জুলাই, তৎকালীন অষ্ট্রিয়ান সাম্রাজ্যের (বর্তমান ক্রোয়েশিয়া) একটি ছোট গ্রাম স্মিলজান এ জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা মিলুতিন টেসলা, পেশায় ছিলেন ধর্মযাজক। তিনি চাইতেন, তার ছেলেও যেন তার পেশাতেই যুক্ত হয়, কিন্তু টেসলার তেমন কোনো আগ্রহ ছিলো না। অন্যদিকে, টেসলার মা ডুকা টেসলা, তেমন ভাবে কখনোই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা পান নি। তবুও তার স্মৃতিশক্তি ছিলো অসাধারণ, তিনি সার্বিয়ান মহাকাব্যগুলো অনায়াসেই মুখস্থ বলে যেতে পারতেন। টেসলা বিশ্বাস করতেন যে, তার এই অস্বাভাবিক স্মৃতিশক্তি ও চেতনা শক্তি তিনি তার মার কাছ থেকেই পেয়েছেন। ডুকা টেসলার বাবাও একজন ধর্মযাজক ছিলেন। টেসলা পরিবারের পূর্বপুরুষেরা জাতিতে ছিলেন পশ্চিম সাইবেরিয়ান, তারা মন্টেনেগ্রো অঞ্চলে বাস করতেন।


মিলুতিন টেসলা ও ডুকা টেসলার পাঁচ সন্তান ছিলেন। তিন মেয়ে, দুই ছেলে। নিকোলা টেসলা ছিলেন ভাই বোনদের মধ্যে ৪র্থ। টেসলার বড় ভাই এক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান, তখন তার বয়স ছিলো পাঁচ বছর। সেই সময় টেসলা একটি মানসিক ধাক্কা খান, যা থেকে তিনি পরবর্তীতে আর বেড়িয়ে আসতে পারেন নি। ১৮৬১ সালে, টেসলাকে স্মিলজানের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করা হয়। সেখনে তিনি জার্মান, গণিত ও ধর্ম শিখতেন। পরবর্তীতে তার পরিবার গোসপিকে স্থানান্তর হলে, টেসলা সেখানে তার প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। পরবর্তী সময়ে, ১৮৭৩ সালে, কারলোভাকে তিনি তার উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষা সম্পন্ন করেন।


১৮৭৪ সালে তিনি অষ্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির হয়ে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন, পরবর্তীতে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও বিজ্ঞান বিষয়ক ক্লাবেও যুক্ত হন। এই সময়ে তিনি মার্ক টোয়েনের সাথেও কাজ করেছেন। তখন তিনি তার বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞান বিষয়ে মেধা তালিকায় প্রথম হওয়ায় ও তার অন্যান্য গুণাবলির জন্য তাকে মেধাবৃত্তি প্রদান করা হয়। কিন্তু পরবর্তীকালে তিনি জুয়া খেলায় আসক্ত হয়ে পড়লে তার বৃত্তি ছিনিয়ে নেয়া হয়। এই সময় তাকে অনেক বাঁধা-বিপত্তির সম্মুখীন হতে হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত, ১৮৭৮ সালে তিনি তার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের ইতি টানেন, পরিবারকে কিছু না জানিয়েই। এরপর তিনি মারিবর চলে যান। আবার ফিরেও আসে ১ বছর পর। ফিরে আসার কয়েক দিন পরই টেসলার বাবা মারা যান। বাবা মারা যাওয়ার পর টেসলা আবার তার পড়াশোনা চালু করেন। কিন্তু বেশ একটা সুবিধে করতে না পেরে বুদাপেস্ট চলে যান। সেখানে তিনি একটি কোম্পানিতে চাকরি করতে থাকেন। তার কোম্পানিতে থাকা কালীন সময়ে কোম্পানিটি অনেক উন্নতি করতে সক্ষম হয়। ধীরে ধীরে তিনি কোম্পানিটির প্রধান ইলেক্ট্রিশিয়ানে পরিণত হন।


তারপর তিনি ফ্রান্সে পাড়ি জমান। সেখানে তিনি থমাস আলভা এডিসন এর কোম্পানিতে চাকরি পান এবং তার কাজের ফলস্বরূপ ১৮৮৪ সালে, তাকে এডিসনের নিউইয়র্কের কোম্পানিতে মেকানিক্স নিয়ে কাজ করার জন্য পাঠানো হয়। ১৮৮৫ সালে, তাকে তড়িৎ জেনারেটর বানানোর প্রস্তাব দেয়া হয়। তিনি সেই প্রস্তাবে রাজি হন। এডিসন তখন বলেন, যদি টেসলা তাকে উন্নত তড়িৎ জেনারেটর বানিয়ে দিতে পারেন তাহলে তাকে ৫০ হাজার ডলার দেয়া হবে। কিন্তু টেসলা যখন সেই কাজে সফল হন তখন তিনি তার প্রাপ্য মূল্য পান নি। এডিসন জানান যে তিনি মজা করে কথাটি বলেছিলেন এবং তিনি টেসলার প্রতি খুশি হয়ে তার বেতন ১০-১২ ডলার বাড়াতে চান। কিন্তু টেসলা তাতে রাজি হন নি এবং সেই কোম্পানি থেকে বেড়িয়ে আসেন।


১৮৮৬ সালে, টেসলা রবার্ট লেন ও বেঞ্জামিন ডালে এর একটি কোম্পানিতে কাজ শুরু করেন। সেখানে থাকাকালীন তিনি বৈদ্যুতিক বাল্ব ও ডায়নামিক যন্ত্রের ডিজাইন তৈরি করেন। কিন্তু, কোম্পানিটি তার এই কাজে আগ্রহ প্রকাশ না করায় তিনি আর এই মডেল নিয়ে এগোতে পারেন নি। পরে, ১৮৮৬ সালে তিনি ওয়েস্টার্ন ইউনিয়নের অধীনে একটি কোম্পানির সাথে চুক্তি বদ্ধ হন। চুক্তির অধীনে থাকায় তিনি তার গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম এবং পর্যাপ্ত আর্থিক সহযোগিতা পান। ১৮৮৭ সালে, তিনি যখন তড়িৎ আবেশ ও মটর নিয়ে কাজ করছিলেন, তিনি এসি মটর আবিষ্কার করেন। পরবর্তীতে সেই এসি মটরের স্বত্ত্ব জর্জ ওয়াশিংটন কিনে নেন এবং টেসলা ওয়াশিংটন হাউজের হয়ে কাজ করা শুরু করেন। ১৮৯১ সালে, টেসলাকে আমেরিকার নাগরিকত্ব প্রদান করা হলে, পরবর্তীতে তিনি সেখানেই বসবাস করতে থাকেন।


বৈদ্যুতিক মটরের আধুনিকায়ন ছাড়াও তিনি বৈদ্যুতিক বাল্ব, রেডিও, এক্স-রে,কলোরাডো স্প্রিং, ওয়েরডেন ক্লিফ সহ বিভিন্ন প্রজেক্ট, আবিষ্কার বা আধুনিকায়নের সাথে সরাসরি ভাবে যুক্ত ছিলেন। তাছাড়া, ধারনা করা হয় যে, তিনি এমন কিছু অস্ত্র/যন্ত্র আবিষ্কার করেছিলেন, যেগুলো যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যাবহার করলে মুহূর্তের মধ্যেই প্রতিপক্ষকে উড়িয়ে দেয়া যেত। যুদ্ধে জয় করা হতো তুড়ি মারার মতো সহজ। কিন্তু তার আবিষ্কার গুলো, পৃথিবী ধ্বংসের কারণ হতে পারে ভেবে, পরবর্তীতে সেগুলো পুড়িয়ে ফেলা হয় বা সমুদ্রে ফেলে দেয়া হয়।


নিকোলা টেসলা সারাজীবনই একা কাটিয়ে দিয়েছিলেন।প্রচন্ড কর্মব্যস্ততায় বিয়ে করেননি তিনি,না তাঁর জীবনে ছিলো কোন মেয়েবন্ধু।

শেষজীবনে এসে বেশ অর্থকষ্টে ভোগেন এই মহান সাইনটিস্ট এবং অবশেষে ১৯৪৩ সালের ৭-ই জানুয়ারি নিউইয়র্কের A Whyndam Hotel -এ নিসংগ নিকোলা টেসলা নিজের শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।

Post a comment

1 Comments

  1. ব্রো আপনার ট্রেমপ্লেট টা শেয়ার করা যাবে???

    ReplyDelete